মনুষ্যজাতির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস- অধ্যায়: ১

ইউভাল নোয়া হারারি ইতিহাস পড়ান হিব্রু ইউভার্সিটি অব জেরুজালেমে। তাঁর রচিত বেস্টসেলার বই ‘Sapiens: A Brief History of Humankind‘ সম্প্রতি বেশ আলোড়ন তুলেছে। এরই মধ্যে এই বইটি প্রায় ৩০টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। বইটিতে লেখক মানব জাতির বিবর্তন থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিপ্লবের নানা বিষয় অত্যন্ত দারুণভাবে বর্ণনা করেছেন। সবচেয়ে আগ্রহোদ্দীপক ব্যাপার হলো, বিভিন্ন বিশ্লেষণে তিনি ব্যবহার করেছেন বিবর্তনীয় জীববিদ্যার নানা সিদ্ধান্ত। বইটির বাংলা অনুবাদ শুরু করেছি। অনুবাদ নিয়ে সকলের মতামত কামনা করছি।
সাজেদুল ওয়াহিদ নিটোল

ইয়োভাল নোয়া হারারি রচিত ‘সেপিয়েন্স: এ ব্রিফ হিস্টোরি অফ হিউম্যানকাইন্ড

অধ্যায়: ১
একটি গুরুত্বহীন প্রাণী

আজ থেকে প্রায় ১৩.৫ বিলিয়ন বছর আগে, বিগ ব্যাং নামক এক মহাজাগতিক ঘটনার ফলে বস্তু, শক্তি, সময় এবং স্থানের উদ্ভব ঘটেছিল। আমাদের মহাবিশ্বের এসব মৌলিক প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যকে ব্যাখ্যা করে জ্ঞানের যে শাখা- তার নাম পদার্থবিদ্যা।

বিগ ব্যাং এর প্রায় তিন লক্ষ বছর পর, বস্তু ও শক্তির পারস্পরিক মিথষ্ক্রিয়ায় পরমাণু নামক জটিল কাঠামো তৈরি হতে থাকে; কিছু পরমাণু পরবর্তীতে একত্রিত হয়ে অণুতে পরিণত হয়। এই পরমাণু, অণু এবং তাদের পারস্পরিক মিথষ্ক্রিয়ার গল্প শোনায়- রসায়ন।

প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন বছর পূর্বে, পৃথিবী নামক গ্রহে, কিছু নির্দিষ্ট অণুর বিক্রিয়ায় কিছু বৃহৎ ও জটিল কাঠামো গঠিত হলো; জন্ম নিলো প্রাণ। প্রাণ ও জীবের গল্পটি হলো জীববিদ্যা।

৭০,০০০ বছর আগে, হোমো সেপিয়েন্স নামক একটি প্রজাতি বিস্তৃত সামাজিক কাঠামো গড়ে তুলতে শুরু করে; যাকে বলা হয় সংস্কৃতি। মানুষের সংস্কৃতির ক্রমবিকাশই গড়ে তুলেছে ইতিহাস।

তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিপ্লব ইতিহাসের গতিপথকে আকার দিয়েছে: (১) বৌদ্ধিক বিপ্লব; ৭০ হাজার বছর আগে যার ফলে আধুনিক মানব-ইতিহাসের সূচনা হয়। (২) কৃষিজ বিপ্লব; যা শুরু হয়েছিল ১২,০০০ বছর পূর্বে; (৩) বৈজ্ঞানিক বিপ্লব; যা মাত্র ৫০০ বছর আগে ঘটেছে, যে বিপ্লব টেনে আনতে পারে ইতিহাসের সমাপ্তি কিংবা জন্ম দিতে পারে সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছুর। আলোচ্য তিনটি বিপ্লব কিংবা আন্দোলন কীভাবে মনুষ্য প্রজাতি এবং তার সঙ্গী জীবজগতকে প্রভাবিত করেছে- এই গ্রন্থ সেই গল্পটিই বলছে।

ইতিহাসের সূচনালগ্নের বহু আগে থেকেই মানুষ পৃথিবীতে ছিল। সর্বপ্রথম মনুষ্য আকৃতির প্রাণীর আবির্ভাব ঘটে প্রায় ২.৫ মিলিয়ন বছর পূর্বে। কিন্তু আদি মানবেরা অগণিত প্রজন্ম ধরে হাজারো প্রজাতির জীবের সাথে নিজেদের আবাস ভাগাভাগি করে নিলেও বাকিদের চাইতে খুব একটা স্বতন্ত্র ছিল না।

আপনি যদি আজ থেকে ২ মিলিয়ন বছর আগের পূর্ব আফ্রিকায় বেড়াতে যান, তাহলে কিছু পরিচিত মনুষ্য চরিত্রের মুখোমুখি হয়ে যেতে পারেন, যাদের মধ্যে থাকতে পারে: শিশুকে বুকে চেপে রাখা উদ্বিগ্ন মা; কাঁদায় খেলে বেড়ানো উচ্ছৃঙ্খল ছেলেপেলে; সমাজের কর্তৃত্বে বিরক্ত মেজাজি যুবক; ক্লান্ত বুড়ো যারা একটু শান্তিতে থাকতে চায়; কোনো সুন্দরীর আকর্ষাণার্থী বুক চাপড়ে বেড়ানো পেশিবহুল পুরুষ; এবং জীবনের সব দেখে ফেলা বৃদ্ধ কর্ত্রী। এইসব আদি-মানবেরা ভালোবাসতো, খেলত, তৈরি করতো বন্ধুত্ব; আবার ক্ষমতা ও মর্যাদার জন্য নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতো। কিন্তু শিম্পাঞ্জী, বেবুন এবং হাতিরাও তো তা-ই করতো। এসবের মাঝে অসাধারণ কিছুই ছিল না। সে যুগের পৃথিবীর কারো কাছে বিন্দুমাত্র ধারণাই ছিল না যে এই প্রাগৈতিহাসিক মানবদের উত্তরসূরিরা ভবিষ্যতে কোনো একদিন চাঁদে হেঁটে বেড়াবে, বিভাজিত করবে পরমাণু, উপলব্ধি করবে জিনের সংকেত এবং লিখবে ইতিহাসের বই। এমনকি আদি মানবেরাও হয়ত নিজেদের নিয়ে এমন উচ্চাকাঙ্ক্ষা রাখত না। প্রাগৈতিহাসিক মানবদের সম্পর্কে যে বিষয়টি জানা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো- এরা ছিল তাৎপর্যহীন ও গৌণ প্রাণী-গোষ্ঠী যারা তাদের প্রতিবেশে কোনো গরিলা, জোনাকিপোকা কিংবা জেলিফিশের চেয়ে খুব একটা বেশি প্রভাব রাখতে পারে নি। বিস্তারিত পড়ুন

তারেক অণুর সঙ্গে “পৃথিবীর পথে পথে”

“এই ছেলেটার নাম কি জানো?
-এই ছেলেটা তারেক।
একসঙ্গে কাজ করে সে
মাত্র গোটা চারেক!”

জনপ্রিয় ছড়াকার লুৎফুর রহমান রিটনের লেখা এই ছড়াটি “পৃথিবীর পথে পথে” বইয়ের ফ্লাপে শোভা পাচ্ছে। পুরো ছড়াটি পড়ে পাঠক আলোচ্য বইয়ের লেখক তারেক অণু’র ঠিকুজি জেনে যাবেন। সব্যসাচী তারেক অণু ‘পর্বত শিখর জয় করতে ভালোবাসেন, ডুব দেন সাগরতলে, তার চেয়েও বেশি উপভোগ করেন পাখির পিছনে দৌড়ে সকালকে বিকেল করে দিতে’। পর্যটক ও অভিযাত্রী তারেক অণু তাঁর বিভিন্ন ভ্রমণ এবং অভিযাত্রা নিয়ে লিখেছেন নানা পত্রিকায় এবং অনলাইন ব্লগে। বাংলা সাইবার জগতে বেশ জনপ্রিয় ব্লগার উনি। তাঁর লিখিত সমস্ত ভ্রমণ-গল্প এবং এডভেঞ্চার স্থান করে নিয়েছে “পৃথিবীর পথে পথে” বইতে।

20813002

আলোচ্য ভ্রমণ-সংকলনের একটি বৈশিষ্ট্য প্রথমেই উল্লেখ করা দরকার। সাধারণত ভ্রমণকাহিনীগুলোর বিস্তৃতি সীমিত কিছু অঞ্চলে আবদ্ধ থাকে এবং লেখকের প্রচেষ্টা থাকে সেসব দেশ কিংবা অঞ্চলের গল্প তুলে ধরা। কিন্তু তারেক অণু তাঁর বইকে অল্পস্বল্প অঞ্চলে আবদ্ধ রাখেন নি। তাঁর ভ্রমণ-গল্পের বিস্তৃতি হিমালয় থেকে ক্যারিবিয়ান সাগর, ভিসুভিয়াস থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা, তিব্বত থেকে প্যারিস, এক্রোপলিস থেকে মাচু পিচু, চিতোয়ানের গহীন বন থেকে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির গ্রাম পর্যন্ত। সর্বমোট ৪৫ টি ভ্রমণকাহিনী নিয়ে সাজানো ‘পৃথিবীর পথে পথে’ গ্রন্থকে লেখক বিষয় ও বৈশিষ্ট্য অনুসারে সাতটি অংশে ভাগ করেছেন। এতে পাঠকদের সুবিধে হলো-একই গোত্রীয় কাহিনীগুলো একসাথে উপভোগ করতে পারবেন। মোটা দাগে বিভক্তিকরণ সঠিক বলেই মনে হয়, যদিও আমি মনে করি “মানুষের গল্প জনপদের গল্প” অংশে থাকা ‘ডারউইন তীর্থে’ এবং ‘কারাগারের মালি ম্যান্ডেলার পদক্ষেপে’ কাহিনী দু’টো বরং “পথের বাঁকে ইতিহাস” অংশেই মানায়।

বইয়ের শুরু “তুষার ও অগ্নির উপাখ্যান” দিয়ে। লেখক একজন অভিজ্ঞ পর্বতারোহী। তাঁর এডভেঞ্চারগুলোর বর্ণনা মিলবে এই অংশে। লেখক তাঁর পর্বতারোহণের অভিজ্ঞতা নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন, বেশ গুছিয়ে। তাঁর লেখা পড়ে পাঠকে ঘুরে আসে বিশ্বের উচ্চতম বেস ক্যাম্প থেকে, লেখকের কষ্টকর অভিজ্ঞতা থেকে ওখানকার জীবনযাত্রার কিছুটা ছোঁয়া পাওয়া যায়। প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে ইউরোপের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ ‘মঁ ব্লাঁ’ জয়ের গল্প পড়ে গর্বিত হতে হয়। আরো একটি প্রথমের সাথে লেখকের যোগ রয়েছে। অভিযাত্রী ইনাম আল হকের সাথে একত্রে উপস্থিত হয়েছেন একেবারে উত্তর মেরুতে,এখানেও বাংলাদেশীদের মধ্যে প্রথম। উত্তর মেরুতে পদার্পণের সেই অসাধারণ গল্প পাঠককে মোহাবিষ্ট করবে, জেগে উঠবে মেরু ভালুকে দেশে ভ্রমণের ইচ্ছা।

কোনো ভ্রমণকাহিনীই সার্থক হয়ে ওঠে না যদি না ওতে মানুষের কথা উঠে আসে। মানুষ,সভ্যতা এবং সংস্কৃতি- ভ্রমণ-গল্পের অতি গুরুত্বপূর্ণ ক’টি উপাদান। তারেক অণুর গল্পে প্রায়ই উঠে এসেছে ভ্রমণাঞ্চলের মানুষের কথা,তাদের সংস্কৃতির কথা। এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অংশটির নাম “মানুষের গল্প জনপদের গল্প”, যেখানে পৃথিবীর নানান রঙের-বর্ণের এবং প্রান্তের মানুষের চিত্র আঁকা হয়েছে। বিশেষ করে সাবেক কলোনিগুলো ঘুরে ঘুরে লেখক সেখানকার বর্তমান চিত্র বোঝার চেষ্টা করেছেন। শ্বেতাঙ্গ ও ঔপনিবেশিকদের দ্বারা শোষিত, নিগৃহীত এবং বঞ্চিত আদিবাসীদের মুখের হাসির নিচে লেখক খুঁজে পেয়েছেন কান্নার শব্দ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আদিবাসীরা পৃথিবীর সর্বত্রই একই ভাগ্য বরণ করেছে। আলোচ্য অংশটিতে ফুটবলের শহর ব্যোকায় তারেক অণুর চরকির মতো ঘোরার খবর মিলবে; মিলবে নিশীথ সূর্যের দেশ নরওয়েতে কয়েকজন মিলে রোড ট্রিপের ঠিকুজি। ব্রাজিলের বস্তি শহর ফাভেলা,যা মাদক ব্যবসা ও চোরাচালানকারীদের স্বর্গ, সেখানে লেখকের ভ্রমণের ইচ্ছা জ্ঞাপন পাঠককে একটু বিস্মিত করতে পারে যদি না লেখকে বিচিত্র খেয়ালের সাথে আগে থেকেই পরিচয় থাকে। একদিকে লেখক ঘুরে আসেন পবিত্র ক্রুশের পাহাড় থেকে, দর্শন নেন রিও’র যিশু’র; অন্যদিকে ডারউইনের বাড়ি ভ্রমণ নিয়ে থাকেন উচ্ছ্বসিত। আমরা পরিচিত হই এক উদার ও মুক্তমনা মানুষের সাথে। আলোচ্য অংশটুকুর সবচেয়ে সুলিখিত এবং আকর্ষণীয় দু’টি রচনা হলো ‘‘আমার কিউবা দর্শন’’ এবং ‘‘নাম না জানা ইনকা গ্রাম,লুকোচুরি-রত শিশু এবং আমার মুচি বন্ধু’’। কিউবা নিয়ে রচিত লেখাটি একটু বিশ্লেষণের দাবি রাখে। বিস্তারিত পড়ুন

মৃত্যুচিন্তা কি মানুষকে আরও গোঁড়া করে তোলে?

মনোবিজ্ঞানের গবেষক শেলডন সলোমন ও জেফ গ্রিনল্যান্ড এ ব্যাপারে একটি অনুসন্ধান চালিয়েছিলেন। তাঁরা দু’টি ভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্বাসে বিশ্বাসী কিছু আমেরিকান ছাত্র-ছাত্রী বেছে নিলেন, যাদের অর্ধেক কট্টর রিপাবলিকান, বাকি অর্ধেক কট্টর ডেমোক্রেট। তাদেরকে বলা হয়েছিল, তারা এমন একটি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে যেখানে মানুষের ব্যক্তিত্ব এবং খাদ্যের প্রতি পক্ষপাতের সম্পর্ক আছে কিনা তা খুঁজে দেখা হবে। কিন্তু গবেষকেরা আসলে জানতে চেয়েছিলেন, মৃত্যুচিন্তা প্রবেশ করিয়ে দিয়ে মানুষের ধর্মীয় বা রাজনৈতিক অবস্থানকে ম্যানিপ্যুলেট করা যায় কিনা।

প্রথম ধাপে ছাত্রছাত্রীদেরকে একটি জঘন্য, দুর্গন্ধময়, ঝাঁল সস খেতে দেয়া হলো। এরপর বলা হলো- একটা পাত্রে অন্য একজনের জন্য কিছু সস ঢেলে দিতে। তাদেরকে জানিয়ে দেয়া হলো যে, তারা যে পরিমাণ সস ঢালবে তা অপরজনকে পুরোটাই খেতে হবে। এখন তাদেরকে তারা যে দলের সমর্থক সে দলের কোনো এক সমর্থকের জন্য একটি পাত্রে, এবং প্রতিপক্ষ দলের কোনো সমর্থকের জন্য আলাদা পাত্রে সস ঢালতে বলা হলো। পরীক্ষা শেষে গবেষকরা মেপে দেখলেন যে, নিজ দলের সমর্থক এবং প্রতিপক্ষ দলের সমর্থকের জন্য মোটামুটি প্রায় সমান পরিমাণ সসই ঢালা হয়েছে; প্রতিপক্ষের জন্য একটু বেশি, কিন্তু সেটা খুব উল্লেখযোগ্য নয়।

এরপর অন্য একটি দলকে আনলেন, যাদেরকে অর্ধেক ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্বাসে বিশ্বাসী। এবারে, সস ঢালতে বলার আগে ওদেরকে একটি প্রশ্নপত্র দেয়া হলো এবং সেগুলোর উত্তর দিতে বলা হলো। এই প্রশ্নগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যাতে সবাই নিজ নিজ মৃত্যুচিন্তার ব্যাপারে সচেতন হয়ে ওঠে। প্রশ্নগুলো অনেকটা এমন ছিল- ‘নিজের মৃত্যু নিয়ে ভাবলে আপনার মনে কেমন অনুভূতি জেগে ওঠে?’, ‘আপনার যখন শারীরিক মৃত্যু হবে তখন আপনার সাথে আসলে কী ঘটবে বলে মনে হয়?’ ইত্যাদি ইত্যাদি। এরপর আগের মতোই একইভাবে আলাদা পাত্রে সস ঢালতে বলা হলো। পরীক্ষা শেষে এবার যখন গবেষকরা বিভিন্ন পাত্রের সস ওজন করে দেখলেন, তখন অবাক হয়ে গেলেন। দেখা গেল, শিক্ষার্থীরা তাদের নিজ দলে সমর্থকদের চেয়ে প্রতিপক্ষের সমর্থকের জন্য প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণ ঝাঁল সস বরাদ্দ করেছে। গবেষকেরা নিশ্চিত হলেন, মৃত্যুচিন্তা আমাদের নিজ নিজ বিশ্বাসকে আরো বেশি করে আকঁড়ে ধরার প্ররোচনা দেয়, এবং প্রতিপক্ষ বিশ্বাসে বিশ্বাসী মানুষের বিরোধিতায় উৎসাহ দেয়। এটি মানুষের একটি সহজাত প্রবৃত্তি।

তাদের মতে, “These results suggest that when people are reminded of their own mortality they are going to lash out at those who have a different belief system than their own. The idea being that when we think about our own death we become more invested in our own belief system and someone with a different belief system becomes psychologically threatening, so we are gonna lash out at them, oft-times with violence.”

**********************
নিরীশ্বরবাদী লেখক-ব্লগারকে যখন নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় তখন তাদের প্রতি সহানুভূতির বদলে কেন বিশ্বাসী লোকজন উল্টো নিরীশ্বরবাদী মতাদর্শ এবং সমর্থকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে- এখন বুঝা গেল?
আমরা যদি আমাদের মধ্যে থাকা সহজাত জৈবিক দোষগুলো সম্পর্কে সচেতন না হই তাহলে কীভাবে সামনে এগিয়ে যাব?

মাশুদুল হকের প্রথম থ্রিলার “ভেন্ট্রিলোকুইস্ট”

বিদেশী কাহিনীর ছায়া অবলম্বনে বাংলাভাষায় তথা বাংলাদেশে প্রচুর থ্রিলার লেখা হয়েছে; অনেক থ্রিলারই বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। যদিও সেসব নিয়ে বিতর্ক চালু রয়েছে পাঠক ও সমালোচকদের মধ্যে। অনেক সমালোচকই ধারণা করেছেন যে, বিদেশী সফল থ্রিলারগুলোর মতো সফল থ্রিলার বাংলা ভাষায় লেখার জন্য যে অভিজ্ঞতা প্রয়োজন তা বাংলাভাষী লেখকদের নেই। বক্তব্যটি আংশিক সত্য হলেও থ্রিলার উপন্যাস লেখার ক্ষেত্রে তা বাধা হয়ে দাঁড়াবার কথা নয়। কারণ সব ধরনের থ্রিলার লেখার জন্য ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয় না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে পড়াশুনা ও গবেষণার মাধ্যমে অভিজ্ঞতার ঘাটতি পেছনে ফেলে দেয়া যায়। মাশুদুল হক এমন এক বিষয় নিয়ে তাঁর উপন্যাসের প্লট সাজিয়েছেন যা সম্পর্কে বইপত্র এবং বিশেষ করে ইন্টারনেট থেকে বিস্তৃত তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব। ধারণা করি, তাঁর থ্রিলারে ব্যবহৃত সকল তথ্য তিনি বইপত্র ও অন্তর্জাল থেকেই সংগ্রহ করেছেন এবং অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে তাঁর প্লটে ব্যবহার করেছেন।

আলোচনা করছি মাশুদুল হক’এর থ্রিলার উপন্যাস “ভেন্ট্রিলোকুইস্ট” নিয়ে। শিরোনাম দেখে হয়তো মনে হবে বইটি ভেন্ট্রিলোকুইজমের উপরে ভিত্তি করে লেখা, যদিও তা পুরোপুরি সত্য নয়। হ্যাঁ, গল্পে একজন ভেন্ট্রিলোকুইস্ট আছে যেটি অন্যতম প্রধান একটি চরিত্র, কিন্তু তা-ই সব নয়। ভেন্ট্রিলোকুইজম দিয়ে রহস্যের সূচনা হলেও ঘটনার ডালপালা নানাদিকে গজিয়েছে।

উপন্যাসের প্রধান চরিত্র চারটি- নৃতাত্ত্বিক মারুফ, দৈনিক পত্রিকার ফিচার লেখক রুমী, ভেন্ট্রিলোকুইস্ট শওকত এবং মনো-গবেষক ডাঃ রুশদী। আরো দুইটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হাসান এবং মিলি। পুরো উপন্যাস বর্ণিত হয়েছে প্রথম পুরুষে, মারুফের জবানিতে। থ্রিলার সাধারণত তৃতীয় পুরুষে লেখা হয়, রহস্য বজায় রাখার স্বার্থে। কিন্তু মাশুদুল হক প্রথম পুরুষে গল্প বলার সিদ্ধান্ত নিয়ে বেশ সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু রহস্যের খাতিরে, মারুফ চরিত্রটিকে বেশিরভাগ সময়েই অন্ধকারের রাখতে বাধ্য হয়েছেন লেখক। মারুফকে প্রায় পুরোটা সময়ই তাঁর বন্ধু রুমীর ছায়ার নিচে কাটাতে হয়েছে। গল্পের প্লটে একজন নৃতাত্ত্বিকের চমক দেখাবার জায়গা থাকলেও পুরোটা সময় চমক দেখিয়ে গেছেন পত্রিকার ফিচার লেখক রুমী। মাশুদুল হক কেন এই সিদ্ধান্তটি নিলেন তা তিনিই ভালো বলতে পারবেন। রুমী এই থ্রিলারের সবজান্তা। সে ধর্ম, বিজ্ঞান, গণিত-সব কিছুই জানে। সে মডার্ন আর্কিটেকচার দেখে বলতে পারে এটা কোন ধরনের মন্দির এবং সেখানে প্রবেশের জন্য যে পাসওয়ার্ড দরকার তাও নিমিষে বের করে ফেলে! রুমী গন্ধ ধুঁকেই অজ্ঞান-কারী গ্যাসের নাম জেনে ফেলে, বিশেষ ধরনের বাক্স দেখে এক ব্যান্ডদলের নামের উৎপত্তির কথা মনে পড়ে এবং তা থেকে ডাঃ রুশদীর প্রতিহিংসার কারণ জেনে ফেলে। অথচ নৃতাত্ত্বিক হিশেবে মারুফ এখানে লিড নিতে পারত। সম্ভবত প্রথম পুরুষে বর্ণিত হবার কারণেই মারুফ চরিত্রটিকে লেখক বেশিরভাগ সময় সম্যক পরিস্থিতি সম্পর্কে অজ্ঞ রেখেছেন। যে কারণে রুমী ‘ভেন্ট্রিলোকুইস্ট’ উপন্যাসের নায়ক চরিত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা মারুফ হলেও হতে পারত। আমার মতে, চরিত্র নির্মাণে আরেকটু সময় নিতে পারতেন লেখক (তবে যা দাঁড়িয়েছে তাও বেশ ভালো)। কারণ থ্রিলার উপন্যাসের চরিত্রের ছোটখাটো দিকও অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ বাঁকের উপাদান হয়ে দাঁড়ায়।  বিস্তারিত পড়ুন

শাহাদুজ্জামানের ‘আধো ঘুমে ক্যাস্ট্রোর সঙ্গে’ : বিপ্লবীর সাথে কথোপকথন

শাহাদুজ্জামান পাঠক নন্দিত এবং একই সাথে সমালোচক-প্রিয় লেখক। বৈচিত্র্যময় তাঁর লেখার বিষয়বস্তু। শুরু করেছিলেন ছোটগল্প দিয়ে; ধীরে ধীরে সমকালীন গল্পকারদের মধ্যে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সাক্ষাৎকার নিতে ভালোবাসেন; ‘কথা-পরম্পরা’ নামের বই প্রকাশ করে সাক্ষাৎকারকে করে তুলেছেন শিল্প। করেছেন নানা প্রবন্ধের অনুবাদ, লিখেছেন চলচ্চিত্র নিয়ে, সম্পাদনাও করেছেন গোটা দুয়েক বই। চিকিৎসা নৃবিজ্ঞানের গবেষক হিসেবে নিজের পিএইচডি থিসিসকে ভিত্তি করে গবেষণা গ্রন্থও রচনা করেছেন। অধুনা উপন্যাস রচনায় হাত দিয়েছে এবং সফলতা পেয়েছেন। তাঁর ‘ক্রাচের কর্নেল’ একটি বহুল আলোচিত এবং প্রশংসিত উপন্যাস। শাহাদুজ্জামানের এতো পরিচয় দেবার কারণ, তাঁর লেখার সাথে পরিচিত নয়- এমন পাঠককে এটাই জানানো যে নানা বিচিত্র এবং নানা আঙ্গিকের রচনায় তাঁর পারদর্শিতার প্রমাণ আমরা পেয়েছি। উপরের বিষয়গুলোর সঙ্গে আরো একটি বিষয় যোগ করে নিতে পারেন। সেটি হলো- ডকুফিকশন। ফিদেল ক্যাস্ট্রো’র জীবনের তথ্যগুলো নিয়ে এর সাথে খানিকটা ফিকশন মিশিয়ে তিনি সর্বশেষ যে জীবনী ভিত্তিক গ্রন্থটি রচনা করেছেন, তার নাম- ‘আধো ঘুমে ক্যাস্ট্রোর সঙ্গে’।

ডকুফিকশন’সাহিত্যের একটি আধুনিক হাইব্রিড জনরা। ‘ডকুমেন্টরি’ এবং ‘ফিকশন’ মিশে তৈরি হয়েছে ‘ডকুফিকশন’। বাংলা সাহিত্যে ডকুফিকশনের ধারা খুব একটা পরিচিত নয় পাঠকের মাঝে। অল্প কিছু ডকুফিকশন লেখার প্রয়াস লেখকেরা দেখিয়েছেন। শাহাদুজ্জামানের ডকুফিকশন ‘আধো ঘুমে ক্যাস্ট্রোর সঙ্গে’ইতোমধ্যেই বেশ সাড়া ফেলেছে। যদিও অনেক সমালোচকই তাঁর উপন্যাস ‘ক্রাচের কর্নেল’কে ডকুফিকশন আখ্যায়িত করে থাকেন, আমি একে ঐতিহাসিক উপন্যাস বলতে আগ্রহী। কারণ, এই উপন্যাসের ঘটনাক্রম একেবারে ঐতিহাসিক সত্য; এতে ফিকশনের চেয়ে ইতিহাসের ছায়াই বেশি। কিন্তু ‘আধো ঘুমে ক্যাস্ট্রোর সঙ্গে’র ফিকশনটুকু একেবারে নিখাদ ফিকশন। সমাজতন্ত্রের আদর্শে বিশ্বাসী এক বাংলাদেশি যুবকের কথা লেখক কল্পনা করেছেন যে পৃথিবীর অপর প্রান্তের ছোট্ট দ্বীপদেশ কিউবার দিকে তাকায় কৌতুহলভরে। কিউবার বিপ্লবী ফিদেল ক্যাস্ট্রোর ভাবনায় বিভোর হয়ে একদিন সে যুবক নিজেকে আবিষ্কার করে ক্যাস্ট্রোর পড়ার ঘরে। শুরু ক্যাস্ট্রো ও যুবকের মধ্যকার দীর্ঘ কথোপকথন। এ নিয়েই এগিয়েছে ‘আধো ঘুমে ক্যাস্ট্রোর সঙ্গে’ গ্রন্থটি। যুবকের সঙ্গে কথোপকথনে ক্যাস্ট্রো যে সব তথ্য,যেমন- নিজের পরিবারের ইতিহাস, ব্যক্তিগত তথ্য, কিউবার ইতিহাস, বিপ্লবের ঘটনাবলী ইত্যাদি; দিয়েছেন- সে সমস্ত তথ্য শাহাদুজ্জামান ইতিহাসম্মত এবং বিভিন্ন প্রামাণ্য সূত্র থেকে নিয়েছে। বিভিন্ন বই, ডকুমেন্টরি,ফিচার ফিল্ম- থেকে সাহায্য নেবার কথা লেখক বইয়ের ভূমিকাতেই লিখেছেন। প্রামাণ্য সূত্র থেকে তথ্য নেয়ায় গ্রন্থটি হয়ে উঠেছে চমৎকার ডকুফিকশন- যার মাঝে তথ্য এবং কল্পনার সঠিক মিশ্রণ রয়েছে। বিস্তারিত পড়ুন

বুক রিভিউ : হুমায়ূন আহমেদের “১৯৭১”

১.
হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টিকর্মের সংখ্যা বেশ বড়। তিনি দুই শতাধিক গ্রন্থের রচয়িতা হলেও বাঙালির শ্রেষ্ঠতম অর্জন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাঁর লেখা সাহিত্যকর্মের সংখ্যা হাতে গোণা। সেই অল্প ক’টি সাহিত্যকর্মের একটি ‘১৯৭১’। বইটির বিপণন করা হয়েছে একটি উপন্যাস হিশেবে, যদিও একে ‘উপন্যাস’এর গোত্রভুক্ত করা যায় কিনা তা নিয়ে আমি নিচে আলোচনা করেছি। হুমায়ূন আহমেদ বিচিত্র বিষয়ে উপন্যাস, গল্প লিখেছেন। তাঁর সাহিত্যকর্ম নিয়ে গভীরভাবে বিশ্লেষণ এখনো বাংলাদেশে করা হয় নি; এলিট সাহিত্য-সমালোচকদের কাছে তিনি অপাঙতেয় হয়ে রয়েছেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে উপন্যাসের প্রতি সমালোচকদের বিশেষ মনোযোগ প্রদান অতি-আবশ্যক, কেননা বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার কারণে মানুষ এখনো ইতিহাস নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা ইতিহাসের ভিন্ন ডিসকোর্সের জন্য প্রস্তুত নয়। হুমায়ূন আহমেদের মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক আরেকটি বৃহৎ উপন্যাস ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ যেভাবে সাহিত্য-বিশ্লেষকদের মনোযোগ পেয়েছে, অন্যগুলো তেমনিভাবে পায় নি।
 
 
২.
হুমায়ুন আহমেদ তাঁর ‘১৯৭১’ উপন্যাসের পটভূমি হিশেবে বেছে নিয়েছেন বিচ্ছিন্ন একটি ছোট্ট গ্রাম, নীলগঞ্জকে। ময়মনসিংহ-ভৈরব লাইনের ছোট স্টেশন থেকে প্রায় চল্লিশ মাইল দূরের গ্রাম নীলগঞ্জ, যেখানে যাওয়ার একমাত্র বাহন রিকশা,তাও গ্রীষ্মকালে; বর্ষাকালে কাঁদা ভেঙ্গে হেঁটে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। তৎকালীন জীবনের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন এমন এক নির্জন গ্রাম কেন বেছে নিলেন লেখক- এমন প্রশ্ন মনে জাগতেই পারে। আলোচ্য উপন্যাসে লেখকের মূল আগ্রহ ছিল, গ্রামে মিলিটারি আগমনের ফলে গ্রামের মানুষগুলোর মনো-জাগতিক কম্পন পাঠকের সামনে তুলে ধরা। সে কারণেই হুমায়ূন আহমেদ একটি ছোট গ্রামীণ সমাজ বেছে নিয়েছিলেন। এছাড়া লেখকের বাড়ি ময়মনসিংহ অঞ্চলে হওয়ার কারণে ওখানকার মানুষের সংস্কৃতি, রীতিনীতি, ভাষার সাথে খুব ভালোভাবে পরিচয় আছে তাঁর। ধারণা করি, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রচিত উপন্যাসটিতে তিনি তাঁর কমফোর্ট জোনে থাকতে চেয়েছেন।উপন্যাসের বেশ অনেকটুকু জুড়েই লেখক গ্রামের বর্ণনা দিয়েছেন, বেশিরভাগই আশপাশের পরিবেশ নিয়ে। মানুষের জীবিকার বর্ণনা দিতে গিয়ে এক পর্যায়ে লিখেছেন, “জমি উর্বর নয় কিংবা এরা ভালো চাষী নয়। ফসল ভালো হয় না। তবে শীতকালে এরা প্রচুর রবিশস্য করে। বর্ষার আগে করে তরমুজ ও বাঙ্গি”। এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পরবর্তীতে অপর একটি স্থানে ফসল সম্পর্কিত আরেকটি তথ্য লেখক দিয়েছেন যা পূর্বে প্রদত্ত তথ্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। গল্পের সমস্ত ঘটনা ঘটেছে বৈশাখের একটি দিনে, যেদিন গ্রামে মিলিটারি হানা দেয়। গ্রামবাসীর দৈনন্দিন কাজের বর্ণনা দিতে গিয়ে লেখক লিখেছেন, “উত্তর বন্দে বোরো ধান পেকে আছে। দক্ষিণ বন্দে আউশ ধান বোনা হবে”। লেখক নিজের দেয়া তথ্য ভুলে গিয়ে অন্য একটি তথ্যের যোগান দিয়েছেন, যা না দিলেও গল্পের কোনো ক্ষতি হতো না। ভুলটুকু হুমায়ূন আহমেদের বাক্যে বাক্যে গল্প তৈরির প্রবণতার কারণেই সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া আরো একটি ভুল করেছেন লেখক। নীলগঞ্জ হলো প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি গ্রাম যেখানে বিদ্যুতের আলো পৌঁছে নি। এদিকে বোরো ধান হলো শীতকালে আবাদযোগ্য ধান যার জন্য সেচের ব্যবস্থা থাকা আবশ্যক। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের বেশিভাগ এলাকাতেই বোরো ধানের আবাদ আশির দশকের পূর্বে শুরু হয় নি, কারণ বেশিরভাগ এলাকাই বিদ্যুৎ-বঞ্চিত ছিল। লেখক ইতিহাসের একটি বিশেষ সময় নিয়ে উপন্যাস লিখতে গিয়ে সেকালের পারিপার্শ্বিক অবস্থা পুনঃ-সৃষ্টি করতে গিয়ে কয়েকটি ভুল করেছেন। বিস্তারিত পড়ুন

তাস রহস্য : রূপকথার আড়ালে দর্শন

প্রায় বছর খানেক আগেই ‘সোফির জগত’ পড়েছি, তাই ‘তাস রহস্য’ পড়ার জন্য বেশ উৎসাহী এবং আগ্রহী ছিলাম। ইয়স্তেন গার্ডার দারুণ উদ্ভাবনী শক্তির অধিকারী লেখক। তাঁর লেখা চিন্তাভাবনা নাড়িয়ে দেয়। তাঁর যে আইডিয়াগুলো তাঁর কাজের মাধ্যমে প্রকাশিত হয় তা আমি বেশ পছন্দ করি। নরওয়েজিয়ান লেখক এবং দর্শনের শিক্ষক ইয়স্তেন গার্ডারের ‘সোফির জগত’ দর্শনের ইতিহাস এবং নানান দার্শনিক প্রশ্নাবলী নিয়ে লেখা এক বেস্টসেলার। সে তুলনায় ‘তাস রহস্য’ অধিকতর অভিগম্য, এর বিষয় সরাসরি দর্শন না হলেও এটি পড়ার সময় পাঠক আসলে দার্শনিক প্রশ্নগুলোতেই জড়িয়ে যায়, জেনেই হোক কিংবা না জেনেই হোক। আরো স্পষ্ট করে বললে-  ‘আমি কে?’ ‘এ পৃথিবী কোথা থেকে এলো?’আমরা কোথায় চলেছি?” এমন সব দার্শনিক প্রশ্ন আর ভাবনা লুকিয়ে আছে রূপকথা আর এডভেঞ্চারের আড়ালে, ‘তাস রহস্য’ উপন্যাসে।

গার্ডারের শিশু-কিশোরদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং বক্তব্যের প্রতি পক্ষপাত আছে- যা একদম সুস্পষ্ট। সম্ভবত এ কারণে যে, তিনি অনুভব করেন- শিশুরা এ পৃথিবীকে বড়োদের তুলনায় অধিকতর সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারে। একটি শিশু সবসময় জানতে চাইবে যেকোনো জিনিসের ব্যাপারে- কেন জিনিসটি এমন, যেখানে বড়োরা সে জিনিসের ব্যাপারে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে কিংবা কোনো কিছুই জানতে চায় না। একটি শিশুর দৃষ্টিতে যদি কখনো এ পৃথিবীর দিকে আমরা তাকাই তাহলে হয়ত আমরা আমাদের পুরনো এবং ঘুণে ধরা চিন্তাভাবনাগুলোকে আরো ঝালিয়ে নিতে পারতাম।

তাস রহস্য’এর প্রধান চরিত্র বারো বছরের বালক হ্যান্স টমাস। সে তার পিতার (যিনি কিনা জার্মান পিতার নরওয়েজিয়ান পুত্র!) সাথে ছুটে যায় গ্রিসে, তার মায়ের সাথে দেখা করতে। টমাসের মা মডেল হবার স্বপ্ন নিয়ে তার পরিবার ছেড়ে গ্রিসে চলে যান আট বছর আগে। হ্যান্স ও তার বাবা পুরো ইউরোপ ভ্রমণ করে এবং নানা দার্শনিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। একদিন এক বামুন হ্যান্সকে একটি অতসী কাঁচ উপহার দেয় এবং তাদের ভ্রমণপথকে অন্যদিকে নিয়ে যায়। এভাবে পিতা-পুত্র গিয়ে পৌছয় এক গ্রামে যেখানে হ্যান্স এক রুটি প্রস্তুতকারীর কাছে থেকে পায় বনরুটির ভেতরে লাগানো ছোট্ট বই, যার লেখাগুলো এতোই ছোটো যে খালি চোখে পড়ার কোনো উপায় নেই। তাই হ্যান্স তখন সেই বামুনের দেয়া অতসী কাঁচ দিয়ে পড়তে থাকে বই রহস্যময় বইটি। এটি তাকে শোনায় এক আশ্চর্য গল্প- এক রহস্যময় দ্বীপ, ফ্রোডো নামের নাবিক, এক প্যাকেট তাস এবং ‘রংধনু পানীয়’-যাতে আছে সবকিছুর স্বাদ। বইখানা পড়তে পড়তে হ্যান্স উপলব্ধি করতে পারে যে এই বইয়ের সাথে তার জীবনের কোনো-না-কোনো এক গভীর সংযোগ আছে এবং এটি পড়তে পড়তেই সেই রহস্য উন্মোচিত হবে।
বিস্তারিত পড়ুন